দুই মাস গড়াল ৪০ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচির

হরমুজ প্রণালিতে ট্রাম্পের বীমা সুবিধা নেয়নি একটি জাহাজও

হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের জন্য মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে বীমা সুবিধা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ঘোষণার দুই মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো জাহাজ এ সুবিধা নেয়নি। ৪০ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি থেকে এখন পর্যন্ত ১ ডলারের বীমা সুবিধাও দেয়া হয়নি। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ে। তখন অনেক জাহাজ মালিক ওই পথে চলাচল কমিয়ে দেন। এতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নতুন একটি বীমা কর্মসূচি চালু করে। লক্ষ্য ছিল জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা ও তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘোষণার দুই মাস পরও এ কর্মসূচির আওতায় একটি জাহাজও বীমা সুবিধা নেয়নি।

হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। তাই সেখানে অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়ে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ কর্মসূচিতে সহায়তার জন্য বীমা প্রতিষ্ঠান চাব ও এআইজিকে যুক্ত করে। উদ্দেশ্য ছিল জাহাজ মালিকদের আস্থা ফেরানো। তবে বাস্তবে সে লক্ষ্য পূরণ হয়নি।

বীমা ব্রোকার বা মধ্যস্থতাকারীদের মতে, মার্কিন সরকারের উদ্যোগটি কখনই মাঠ পর্যায়ে কার্যকর হতে পারেনি। কারণ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা এটি পূরণ করতে পারেনি। এর সবচেয়ে বড় ত্রুটি ছিল, বীমা সুবিধা পাওয়ার জন্য শর্ত হিসেবে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারা বা এসকর্ট নেয়ার বাধ্যবাধকতা। কিন্তু বাস্তবে মার্কিন নৌবাহিনীর এমন কোনো নিয়মিত পাহারা ব্যবস্থা বা এসকর্ট দল গঠনই করা হয়নি।

জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দুটি জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার করায় মে মাসের শুরুতে। এটি ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে স্বল্পমেয়াদি একটি উদ্যোগের অংশ ছিল। কিন্তু এরপর আর কোনো জাহাজকে একই ধরনের সহায়তা দেয়া হয়নি।

পুরো প্রকল্পটি পরিচালনা করছে মার্কিন ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (ডিএফসি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলে চলাচল করা সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বীমা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিএফসিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

চাবের মুখপাত্র বলেন, ‘এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল নৌবাহিনীর নিরাপত্তার মধ্যে থাকা জাহাজকে বীমা দেয়া। কিন্তু বাস্তবে এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বিশ্বের সামুদ্রিক বীমার একটি বড় অংশ পরিচালিত হয় যুক্তরাজ্যের ‘লয়েডস অব লন্ডনের’ মাধ্যমে। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এ উদ্যোগ লন্ডনের দীর্ঘদিনের প্রভাবকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কিছু দেখা যায়নি।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় বীমা ব্রোকার প্রতিষ্ঠান মার্শের সামুদ্রিক বীমা বিভাগের প্রধান মার্কাস বেকার বলেন, ‘ফের বাণিজ্য শুরু করাটা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে জাহাজ মালিকদের ওপর। তারা যখন মনে করবেন, পরিস্থিতি তাদের সম্পদ ও নাবিকদের জন্য যথেষ্ট নিরাপদ, তখনই কেবল এ পথ ব্যবহার হবে।’ শুধু বীমা সুবিধা দিলেই হবে না। জাহাজ, পণ্য ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়াও জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজে অন্তত ৩৮টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ১১ জন নাবিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)। এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ বীমার খরচও অনেক বেড়েছে। বর্তমানে একটি জাহাজের মূল্যের ৩-৮ শতাংশ পর্যন্ত বীমা প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে। যুদ্ধের আগে এ হার ছিল খুবই নগন্য।

মার্কাস বেকার জানান, বর্তমানে কিছু বীমা প্রতিষ্ঠানে ‘নো-ক্লেইম’ বোনাস সুবিধাও দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোনো দাবি না এলে কিছু অর্থ ফেরত দেয়া হচ্ছে। তার পরও ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেশি।

তিনি বলেন, ‘ভারত সরকার যে আলাদা সামুদ্রিক বীমা কর্মসূচি চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের তুলনায় বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ ভারতের পরিকল্পনা মূলত অর্থায়ন সহায়তায় সীমাবদ্ধ। সেটি নৌনিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কিছু জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করছে। এসব জাহাজের জন্য বীমা করা হলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে না বা বিস্তারিত জানানো হচ্ছে না। কারণ হরমুজ প্রণালির ওপর এখন কার্যত নিয়ন্ত্রণ রাখছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি। এ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ কারণে অনেক পশ্চিমা বীমা প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে ঝুঁকি নিতে চায় না।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে জাহাজ চলাচল হচ্ছে ইরানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে। আবার কিছু জাহাজকে আইআরজিসির নির্ধারিত অর্থও পরিশোধ করতে হচ্ছে।

ডিএফসির একজন মুখপাত্র বলেন, ‘হোয়াইট হাউজ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ চলছে। প্রয়োজন হলে ৪০ বিলিয়ন ডলারের সামুদ্রিক পুনর্বীমা সুবিধা চালু করা হবে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা কমানো ছাড়া পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ জাহাজ মালিকরা এখন শুধু খরচ নয়, নিরাপত্তাকেও সবচেয়ে বড় বিষয় হিসেবে দেখছেন।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানে যেকোনো অস্থিরতা তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

আরও